বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও বাস্তবতা!

 

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও বাস্তবতা!

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও বাস্তবতা!

স্বাস্থ্যখাত রাষ্ট্রের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বলা হয়ে থাকে, যে দেশের জনগণ শিক্ষা স্বাস্থ্যের দিক থেকে এগিয়ে, সে দেশ উন্নয়ন সমৃদ্ধির দিকে গতিশীল। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা সেবা অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার। সরকারকে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত হিমসিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ তারা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেন না, চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করেন, আয় বাড়ানোর জন্য একগাদা টেস্ট ওষুধ ধরিয়ে দেন ইত্যাদি ইত্যাদি। পেশাদার সৎ মানবিক চিকিৎসক যে নেই, তা নয়; তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল এবং তারাও চিকিৎসক নামের এক ধরনের কসাইদের কাছে জিম্মি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন করেন এবং তুলনামূলক কম খরচে সুচিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরৎ আসেন।

 

প্রাইভেট হসপিটালসের এক তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতিবছর পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। শুধু গত বছর যেসব মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বাইরে গেছে, তাদের শুধু চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই যায় ভারতে। ছাড়া প্রতিটি রোগীর ভ্রমণ, থাকা, খাওয়া আনুষঙ্গিক ব্যয় রয়েছে।


রোগীরা মূলত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অদক্ষতা আস্থার সংকটে বিদেশে যাচ্ছে। চিকিৎসার জন্য ভারত ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কোন শ্রেণি-পেশার মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে বেশি যাচ্ছে তাও উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে দেখা যায় ব্যবসায়ী, বেসরকারি চাকরিজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা শ্রমিকরা বেশি যাচ্ছেন ভারতে। এতে বলা হয়, এই মানুষদের বেশির ভাগই বলেছে, ডাক্তার নার্সিংসেবা ভালো পায় বলে তারা সেখানে যায়। দেশে কেন চিকিৎসা করাচ্ছেন না-এমন প্রশ্নে তারা বলেছেন, দেশে চিকিৎসকদের প্রতি তাদের আস্থা কম। কারণগুলোর মধ্যে এর পরই আছে অপর্যাপ্ত হাসপাতাল, রোগীর নিরাপত্তা এবং সবার পরে খরচের বিষয়টি। ভারতে মেডিক্যাল ট্যুরিজমের ৫৫ শতাংশই বাংলাদেশি। গত তিন বছরে মেডিক্যাল ট্যুরিজমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিরা মূলত ভারতের কলকাতা, নয়াদিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ মুম্বাই শহরে বেশি যাচ্ছে।


আমরা জানি জাতীয় বাজেটে দেশের চিকিৎসা খাতে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দেয়া হয়। যারা সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে পড়াশোনা করছে সাধারণ মানুষের করের টাকায় তাদের পড়াশোনার ৯৫ শতাংশই অর্থের জোগান দেওয়া হয়। দেশের সরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোর পেছনেও ব্যয় করা হয় বিপুল অর্থ। তারপরও দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে চিকিৎসা খাত কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে তা

 

চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বেসরকারি চিকিৎসা খাত সেবার বদলে বাণিজ্যিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উভয় খাতেই বিরাজ করছে যাচ্ছে তাই অবস্থা। দেশের চিকিৎসকদের বেশির ভাগই ওষুধ কোম্পানির হুকুম তালিমের ভূমিকা পালন করছে।


রোগীদের কাছ থেকে বড় অংশের ফি নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারছেন না। ওষুধ কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশন করার নামে তাদের কাছ থেকেও গ্রহণ করছেন বড় অঙ্কের টাকা। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে চিকিৎসকদের অলিখিত চুক্তি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা কমিশনের লোভে যেসব বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার নেই সেসব বিষয়ে পরীক্ষার জন্যও রোগীদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে

 

সব ক্ষেত্রেই চলছে মহা প্রতারণা। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য জাতীয় বাজেটে যে হাজারো কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে তা আদতে খুব একটা কাজে লাগছে না। জনস্বার্থে এসব বিষয়ে সরকারকে কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জাগতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। কালের বিবর্তনে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাণিজ্য প্রাধান্য পাওয়ায় এর মানবিক উপাদানগুলো নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশের সংবিধানে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসাকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গত চার দশকে দেশে বিপুলসংখ্যক সরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরো মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতে

 

বিনা পয়সায় পেয়ে থাকে, কিন্তু বহিঃবিভাগ রোগীদের জন্য ওষুধ বরাদ্দ নেই বললেই চলে। ছাড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বিষেশায়িত হাসপাতালে অনেক বেশি রোগীর ভিড় থাকায় রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ উপজেলা হাসপাতালে রোগীরা ডাক্তার পায় না, ঠিকমতো ওষুধ পায় না, ফলে তারা জেলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আসতে বাধ্য হয়। একসঙ্গে অনেক রোগীর ভিড় থাকায় এসব হাসপাতাল মানসম্মত চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। জেলা উপজেলা হাসপাতালগুলো চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করতে পারলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রোগীর মানসম্মত চিকিৎসা জেলা-উপজেলা হাসপাতালে দেওয়া সম্ভব।


গত ৫১ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ হচ্ছেঅব্যবস্থাপনা সত্যিকার অর্থেই দেশে পেশাদার একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তৃণমূল থেকে যত ওপরে যাওয়া যায় সর্বত্রই একই দৃশ্য প্রতীয়মান হয়। আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে, জিডিপির পাঁচ শতাংশের মতো অর্থ স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া। বাংলাদেশে এক যুগের অধিককাল ধরে বাজেটে জিডিপির এক শতাংশের কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থেরও কম-বেশি ৭০ শতাংশ বেতন-ভাতা ইত্যাদির মতো খাতে খরচ হয়। বাকি অর্থ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা, যা নিতান্তই অপ্রতুল। স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নের

 

১৯৮৯ সালে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার সাবেক সফল রাষ্ট্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদের বাইপাস অপারেশনের প্রয়োজন হয়। তখন মালয়েশিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত ছিল না। মালয়েশিয়ার মন্ত্রী আমলারা সবাই দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য পরামর্শ প্রদান করেন। কিন্তু তিনি দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দেশেই চিকিৎসা সেবা বাড়ানোর ব্যবস্থা করেন। কারণে দেশের হাসপাতালেই তার সফল অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তিনি দেশ প্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। মালয়েশিয়া এখন চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনেক এগিয়ে গিয়েছে এবং বিশ্বমানের চিকিৎসাও ওই দেশে হচ্ছে। বিদেশ থেকেও অনেকে চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়া আসে।

 

করে। চিকিৎসায় যে ধরনের উন্নত আধুনিক সরঞ্জামাদির প্রয়োজন তাও আমাদের আধুনিক উন্নতমানের হাসপাতালগুলোতে রয়েছে। আমাদের দেশের চিকিৎসকদের মান কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো অংশেই বিদেশের উল্লিখিত দেশের চিকিৎসকদের চেয়ে নিম্নতর নয়। দেশের শীর্ষ পদে আসীন কিছু ব্যক্তি, আমলা, রাজনীতিবিদ, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পেশাজীবী দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মোটেও আস্থাশীল নয়। শীর্ষ পদে আসীন এসব ব্যক্তিরা প্রতি বছর নিয়মিত স্বাস্থ্য

 

চিকিৎসা গ্রহণ না করে উদাহরণ সৃষ্টি না করায় অপরাপর ব্যক্তিরা এদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গমনেচ্ছুদের নিবৃত্ত করা গেলে আমাদের বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং অর্থ নিজ দেশে ব্যয় হলে তা নিঃসন্দেহে আমাদের চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে। প্রশ্ন হচ্ছে কবে দেশের মানুষ দেশেই কম খরচে সুচিকিৎসা পাবে এবং ধরনের বিদেশ নির্ভর চিকিৎসা সেবা শেষ হবে!


No comments

Powered by Blogger.